
ব্রিটেন পার্লামেন্টে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিতর্ক সম্পাদনা: ড. নূহ-উল-আলম লেনিন এবং ইরফান শেখ
বিশ্বের সাতটি দেশের সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছিল— বাংলাদেশ, চীন, ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য (UK), যুক্তরাষ্ট্র (USA) এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR)। এই দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং বিনিময়ের ফলেই মুক্তিযুদ্ধ কাশ্মীর থেকে বঙ্গোপসাগরের গভীর জলসীমা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক স্তরে বিস্তৃত হয়েছিল।
এতদসত্ত্বেও, এই দেশগুলোর ভূমিকা নিয়ে খুব বেশি ভালো বই আমাদের চোখে পড়ে না। আজ অবধি মুক্তিযুদ্ধের আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণা মূলত বাংলাদেশ, ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কার্যবিবরণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এমনকি এই গবেষণাগুলোও অনেকাংশে মাধ্যমিক উৎস বা সংবাদপত্রের ক্লিপিংয়ের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু মাধ্যমিক উৎস বা ক্লিপিংয়ের মধ্যে অনেক সময় অনিচ্ছাকৃত রাজনৈতিক পক্ষপাত থেকে যায়। অন্যদিকে, সম্পদ ও তথ্যের স্বল্পতা এবং ভাষা ও রাজনীতির বাধার কারণে চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পাকিস্তানের সরকারি নথিপত্র নিয়ে তেমন গবেষণা হয়নি।
বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারণে ব্রিটিশ ভূমিকা কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল, সেটিও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অধ্যয়ন করা হয়নি। যদিও এক্ষেত্রে ভাষাগত বা রাজনৈতিক বাধা ততটা নেই, তবুও বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি। এর একটি কারণ হতে পারে প্রাথমিক উৎসের অভাব।
প্রায় ৪৫০ পৃষ্ঠার এই বইটির কলেবর বিবেচনা করলে এটি বলা মোটেও অতু্যক্তি হবে না যে, সুয়েজ খালের পশ্চিমে অবস্থিত অন্যান্য পশ্চিমা পার্লামেন্টগুলোর তুলনায় ব্রিটিশ এমপিরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বিতর্ক নিয়ে অনেক বেশি মগ্ন ছিলেন। সারা বিশ্বের মধ্যে ভারতের লোকসভার পরেই ছিল তাদের অবস্থান। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ থেকে ১৬ই ডিসেম্বরের মধ্যে হাউস অফ কমন্স মোট ১২৯ দিন অধিবেশন পরিচালনা করেছিল; যার মধ্যে তারা ৫৫ দিনই মুক্তিযুদ্ধের ইস্যু নিয়ে বিতর্ক করেছেন— যা মোট সময়ের প্রায় ৪৩%।
সেই সময়ে ব্রিটিশ সরকারের অর্থায়নে ৪ সদস্যের একটি সংসদীয় প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশ সফর, পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের শরণার্থী শিবিরে বিদেশের উন্নয়ন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পরিদর্শন, ইয়াহইয়া খানের আমন্ত্রণে বা নিজস্ব অর্থায়নে আরও ৬ জন এমপির বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সফর, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভবন ওয়েস্টমিনস্টারে বাংলাদেশের ডাকটিকিট উন্মোচন কিংবা ১৯৭১ সালে একজন ব্রিটিশ এমপির পাসপোর্টে বাংলাদেশের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের ভিসা সিল— এই সব ঘটনাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিবিড় সম্পর্কের অকাট্য প্রমাণ দেয়।
পার্লামেন্ট কেন এই যুদ্ধের পেছনে এত সময় ও শ্রম ব্যয় করছিল, সেটি একটি স্বাভাবিক প্রশ্ন। আশ্চর্যজনকভাবে এর উত্তর ‘রিয়েলিস্ট’ বা বস্তুবাদী চিন্তা ধারার সাথে খুব একটা খাপ খায় না, কারণ উপমহাদশে ব্রিটেনের জাতীয় স্বার্থ যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীনের স্বার্থের মতো ছিল না।
পার্লামেন্টের এই মনোযোগ ছিল মূলত ব্রিটিশ সরকার এবং সেদেশের সাধারণ মানুষের এই উপমহাদেশের বিপর্যয়ের প্রতি প্রবল আগ্রহের প্রতিফলন। প্রায় ১৯০ বছর এই উপমহাদেশ তাদের শাসনাধীন ছিল। এই ১৯০ বছরের শাসনকাল অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে বাংলার জন্য অনেক বেশি সত্য ছিল, কারণ ঔপনিবেশিক শাসনের দীর্ঘ সময় রাজধানী এই বাংলাতেই অবস্থিত ছিল। বাংলা বা ভারতকে হারানো ব্রিটিশদের কাছে মাত্র ২৪ বছরের পুরোনো স্মৃতি ছিল— ঠিক যেমন আমাদের কাছে ৯/১১-এর হামলা বা রমনার বটমূলে বোমা হামলার স্মৃতি আজও টাটকা।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি, কলকাতার পরেই লন্ডন ছিল বাংলাদেশ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় প্রচার কেন্দ্র। এমনকি মুজিবনগর সরকার লন্ডনে একটি হাই কমিশনও স্থাপন করেছিল, যেমনটি তারা আগে কলকাতায় করেছিল।
সর্বোপরি, রাওয়ালপিন্ডি থেকে মুক্তির পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের গন্তব্য ছিল লন্ডন। পাকিস্তান সরকার তাঁকে সেখানে পাঠায়নি, বরং বঙ্গবন্ধু নিজেই তেহরান, নিউইয়র্ক বা নয়াদিল্লির মতো বিকল্পগুলো বাদ দিয়ে লন্ডনকে বেছে নিয়েছিলেন।
আমরা আশা করি, এই প্রকাশনাটি গঠনমূলক চিন্তার অধিকারী এবং সমাজ গবেষকদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ওপর ব্রিটিশ নীতির অনেক ঘটনা ও অন্তর্দৃষ্টি পৌঁছে দেবে। আমাদের বিশ্বাস, এই বইটি ভবিষ্যৎকে আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য অতীতকে বর্ণনা করতে সাহায্য করবে।